রাজনৈতিক বাস্তবতা ও তফসিল পরিবর্তনের ইতিহাস
সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। সেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রথম আনুষ্ঠানিক ধাপ তফসিল ঘোষণা। আর এই তফসিল শুধু তারিখ ঘোষণা নয়—এটি সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। যা কখনো অস্থির বা সংকটময়, কখনো আলোচনার মাধ্যমে কিংবা চাপের মুখে নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশে নির্বাচনের ইতিহাসে অনেকবার ভোটের তারিখ বদলেছে, আবার কখনো বাতিলও হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিরোধী দলের দাবি কিংবা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কারণে নির্বাচনের তারিখ...
সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। সেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রথম আনুষ্ঠানিক ধাপ তফসিল ঘোষণা। আর এই তফসিল শুধু তারিখ ঘোষণা নয়—এটি সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। যা কখনো অস্থির বা সংকটময়, কখনো আলোচনার মাধ্যমে কিংবা চাপের মুখে নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশে নির্বাচনের ইতিহাসে অনেকবার ভোটের তারিখ বদলেছে, আবার কখনো বাতিলও হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিরোধী দলের দাবি কিংবা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কারণে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন হয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার প্রতিফলন স্পষ্ট হয় নির্বাচনী তফসিলে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ইতিহাস ও পরিবর্তনের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি। ভোট অনুষ্ঠিত হয় একই বছরের ৭ মার্চ।
দ্বিতীয় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালে। এই নির্বাচনের তফসিল একাধিকবার তারিখ পরিবর্তন করা হয়। তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি একেএম নূরুল ইসলাম ওই নির্বাচনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, সামরিক শাসনের পর এই নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সূচনা।
১৯৭৮ সালের ৩০ নভেম্বর রাতে জিয়াউর রহমান জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। পরদিন ১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন ১৯৭৯ সালের ২৭ জানুয়ারি ভোটের তারিখ নির্ধারণ করে।
তফসিল ঘোষণার পর বিএনপি ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো সামরিক আইন প্রত্যাহার, দমনমূলক আইন বাতিল, রাজনৈতিক বন্দিদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং জিয়াউর রহমানের সেনাবাহিনী থেকে অবসরসহ একাধিক দাবিতে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে একাধিক বৈঠক ও আলোচনার পর রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু দাবি পূরণে সমঝোতা হয়। কিন্তু দলগুলো তাদের সবগুলো দাবিতে অনড় থাকে এবং ভোটের তারিখ পেছানোর আহ্বান জানায়। পরে নির্বাচন কমিশন ভোটের তারিখ পরিবর্তন করে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করে।
রাজনৈতিক দলগুলো তখন সামরিক আইন প্রত্যাহারের জন্য জোর দেয়। ওই বছর ২৬ ডিসেম্বর আবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন জিয়াউর রহমান। তিনি জানান, সংসদের প্রথম অধিবেশনে সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হবে।
এ ঘোষণার পর কিছু দল তফসিলে সংশোধনের অনুরোধ জানায়। সে অনুযায়ী কমিশন ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করে।
১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় নির্বাচনেও একাধিকবার তফসিল ঘোষণা ও বাতিলের ঘটনা ঘটে। নির্বাচনী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালে প্রধান সামরিক প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ঘোষণা করেন, ১৯৮৪ সালের ২৪ মে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ২৫ নভেম্বর সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানালে নির্বাচন স্থগিত করে নতুন তারিখ ঘোষণা করেন এরশাদ। ১৯৮৪ সালের ২৭ মে একই দিনে রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দেন তিনি।
দলগুলোর অব্যাহত আন্দোলনের মুখে এই তারিখও বাতিল হয়। দলগুলোর দাবি ছিল, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে সংসদ নির্বাচনের।
উত্তাল এ পরিস্থিতি চলে বেশ কয়েক মাস। এরশাদের প্রথম ঘোষণার প্রায় এক বছর পর ১৯৮৪ সালের ৩ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন আবারও নতুন তারিখ ঘোষণা করে। ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনের তারিখ ধার্য হয়।
তবে দলগুলো নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে আগের ঘোষণার ২৪ দিনের মাথায় ২৭ অক্টোবর ফের তফসিল বাতিল করা হয়।
অবশেষে ১৯৮৫ সালের মার্চে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় এক বছর পর ১৯৮৬ সালে ২ মার্চ এরশাদ ঘোষণা করেন, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
একইদিনে নির্বাচন কমিশন ২৬ এপ্রিল ভোটগ্রহণের তারিখের কথা জানায়।
প্রাথমিকভাবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি-রব) একটি অংশ আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগ্রহ দেখায়। প্রধান বিরোধী জোট—১৫ দলীয় ও ৭ দলীয় জোট বিক্ষোভ অব্যাহত রাখে।
পরে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগে ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ এরশাদ বলেন, কিছু দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে এবং সরকার তাদের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করবে। সেদিন মধ্যরাতে ১৫-দলীয় জোটের নেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। জামায়াতে ইসলামীও যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯৯১ সালের নির্বাচনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি পাঁচ বছর পর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক বিধান থাকলেও সেবার মাত্র দুই বছরের মাথায় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৮৭ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সংসদ ভেঙে দিলে পরের বছর মার্চে চতুর্থ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু তখনকার প্রায় সব প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ওই নির্বাচন বর্জন করে।
গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর ঘোষণা দেয়, ১৯৯১ সালের ২ মার্চ সংসদ নির্বাচন হবে। পরে শবে কদরের কারণে ভোটের তারিখ এগিয়ে ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ইসির একাধিকবার নির্বাচনের তারিখ ও তফসিল পরিবর্তন বা বাতিল হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিরোধী দলের অনড় অবস্থানের মধ্যে ১৯৯৬ ও ২০০৭ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই পরিবর্তনগুলো ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিরোধী দলের আন্দোলনের মধ্যে ১৯৯৫ সালের ৩ ডিসেম্বর ইসি ঘোষণা করে, ১৯৯৬ সালের ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ক্ষমতাসীন বিএনপি ও আরও ৫৯টি দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে কয়েক ঘণ্টা পর নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে ৭ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করে। তবে, তিনটি প্রধান বিরোধী দল ওই বৈঠকে অংশ নেয়নি।
১৯৯৬ সালের ৩ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল। কিন্তু ২ জানুয়ারি ইসি সময় বাড়িয়ে মনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখ নির্ধারণ করে ৮ জানুয়ারি।
নতুন সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র এক ঘণ্টা আগে ইসি আবারও তফসিল সংশোধন করে। এবার মনোনয়ন জমা ও প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৩ জানুয়ারি এবং ভোটগ্রহণের তারিখ ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়। প্রধান বিরোধী দলগুলোর মৌখিক ও লিখিত অনুরোধের পর ইসি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে জানালেও দলগুলোর নাম উল্লেখ করেনি তখন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনে থাকা প্রধান বিরোধী দলগুলো ওই নির্বাচনে অংশ নেয়নি।
ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় এক মাস পর খালেদা জিয়ার সরকার ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর ইসি সপ্তম জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম জাতীয় নির্বাচনে সব দল অংশ নেয়।
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ২০০১ সালের ১৯ আগস্ট। ভোটগ্রহণের তারিখ ছিল ১ অক্টোবর।
২০০৬ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ইসি ২৭ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা করে। নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ হয় ২০০৭ সালের ২১ জানুয়ারি।
সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে ৭ ডিসেম্বর ইসি ভোটের তারিখ পরিবর্তন করে ২৩ জানুয়ারি নির্ধারণ করে। ২০ ডিসেম্বর তফসিল আবারও সংশোধন করা হয়। মনোনয়ন জমার শেষ তারিখ ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ২৪ ডিসেম্বর পঞ্চমবারের মতো তফসিল পরিবর্তন করে ইসি। এবার ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ হয় ২২ জানুয়ারি। আর মনোনয়ন জমার তারিখ ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিতর্কের মধ্যে শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ভোটের তারিখ বাতিল করা হয়।
ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর, আগের তফসিল সম্পর্কিত সব কার্যক্রম বাতিল করে।
২০০৮ সালের ২ নভেম্বর নবম সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয় ২০০৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর।
পরে কমিশন আরও দুইবার নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করে। তৃতীয়বার ২৯ ডিসেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করে।
এরপর ২০১৩ সালে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার মধ্যে ২৫ নভেম্বর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে কমিশন। ভোটগ্রহণের দিন ধার্য করা হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। প্রধান বিরোধীদলগুলো এ ভোট বর্জন করে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২০১৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর। এই তারিখ ঘোষণার চারদিনের মাথায় নির্বাচন কমিশন ৮ নভেম্বর আবারও ভোটের তারিখ পরিবর্তন করে।
বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর নির্বাচন এক মাস পিছিয়ে দেওয়ার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণের নতুন তারিখ নির্ধারণ করে কমিশন।
দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর। ২০২৪ সালের ১৭ জানুয়ারি ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করে নির্বাচন কমিশন।